রাজধানী সহ সারাদেশে একযোগে শুরু হয়েছে চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী, রাহাজানির মহড়া। এসব সন্ত্রাসীদের কেউ কেউ আটক হলেও অধিকাংশই রয়েছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। সবমিলিয়ে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে সাধারণ মানুষ, রীতিমতো আতঙ্কে দিনপার করছেন ভুক্তভোগী পরিবার গুলো। তবে দীর্ঘ ১৫-১৭ বছর যাবত যারা এমন সন্ত্রাস চালিয়ে আসছে, তাদেরকেও ধরতে না পারার অভিযোগ রয়েছে পুলিশের বিরুদ্ধে। বিশেষ করে রাজধানীর মিরপুর, কাফরুল, ভাষানটেক সহ আশপাশের এলাকাগুলোতে এক আতঙ্কের নাম কুখ্যাত সন্ত্রাসী শাহীন শিকদার। যার ভয়ে কোনো মামলা তো দূরের কথা- অভিযোগ করতেও সাহস পায় না সাধারণ মানুষ।
বিভিন্ন ভুক্তভোগীর অভিযোগের ভিত্তিতে ২০২৪ সালের আগস্ট মাস থেকে অনুসন্ধান শুরু করি আমরা। বিগত সময়ের তুলনায় সম্প্রতি রাজধানীর মোহাম্মদপুর, মিরপুর, কাফরুল, ভাষানটেক, পল্লবী সহ বিভিন্ন এলাকায় চাঁদাবাজি দিন দিন বেড়েই চলেছে। চাঁদা না দিলে গুম, খুন, হত্যার চেষ্টার আতঙ্কে আছে অসংখ্য পরিবার। অবশেষে বাধ্য হয়ে তারা সাংবাদিকদের কাছে তাদের অসহায়ত্বের কথা বর্ণনা করে।
অভিযোগ এসেছে, দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে রাজধানীতে বিভিন্ন ব্যক্তি, পরিবার, প্রতিষ্ঠানকে টার্গেট করে সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজির অভয়ারণ্যে পরিনত করেছে শাহীন শিকদার নামের এক সন্ত্রাসী। অবশ্য শাহীন শিকদার নিজেকে শীর্ষ সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচয় দিয়ে ফোন করেন সকলকে। এতেই আতঙ্কের মাত্রা বেড়ে যায় ভুক্তভোগীদের। আর এসব অপকর্মে সহায়তা করে মিরপুর, কাফরুলের অসংখ্য গ্যাং।
নাম পরিচয় গোপন রেখে শাহীন শিকদারের ভয়াল অধ্যায়ের বর্ণনা করেন অসংখ্য মানুষ। শুধুমাত্র মিরপুর, কাফরুল, ভাষানটেকেরই ১৯ জন ভুক্তভোগী তাদের দুর্দশার কথা স্বীকার করেন। এক ভুক্তভোগী বলেন, “শাহীন সিকদার +১৬১৩৫০৫০১৭০, +১৬১৩৭০২৫২৬২ নাম্বার থেকে ফোন করে চাঁদা চায়। চাঁদা দিতে অস্বীকার করলে পরিবারের বাচ্চা কিডন্যাপ, খুন করার মত হুমকি দেয়। দলবল নিয়ে ঘরে এসে কুপিয়ে যাবে বলে নানা রকমভাবে হুমকি ও ভয়ভীতি দেখায়। কাফরুল এলাকার অনেক পরিবার আছে যারা গোপনে চাঁদা দেয় শাহীনের হুমকির ভয়ে। এমনকি থানায় মামলা বা অভিযোগ করলে থানা থেকে বের হওয়ার সাথে সাথেই ফোন করে, মামলা তুলে নেয়ার হুমকি দেয়। অর্থাৎ পুলিশের মধ্যেও তার সোর্স আছে।”
আরেক ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী বলেন, “শাহীন শিকদারের বড় একটা গ্যাং চাঁদাবাজির নেপথ্যে কাজ করে। বিভিন্ন অভিজাত ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, আবাসিক এলাকায় তার সোর্স বা ইনফরমার আছে। কাফরুলে কয়েকটি সন্ত্রাসী ঘটনায় মৃত্যুর ভয় নিয়েই কাফরুল থানায় মামলা করেছে তারা। মামলার আলোকে শাহীন সিকদার গ্যাংয়ের দুই আসামি রবি শেখ ও জুম্মনকে আইনের আওতায় আনা হয়। তবে তার দলের মুরাদ, বিপ্লব, অভি, হেলেনা, বাচ্চু, মিরপুর ১১ স্বর্ণপট্টি বিহারি ক্যাম্পের আসিফ সহ অনেকে পলাতক আছে। মূলত আসিফ টাকা ছিনতাই করলে তার পরিবার চালাকি করে আসিফকে বাঁচাতে রিহাবে পাঠিয়েছে।
শাহিন সিকদার কিছুদিন আগে ভারতে অবৈধ অনুপ্রবেশের দায়ে আটক হয়েছে। তবে শাহীনকে ভারতের জেল থেকে বাংলাদেশে এনে তাকে উপযুক্ত শাস্তির ব্যবস্থা করা হোক। কারণ সে ছাড়া পেলেই অভিযোগকারী সবাইকে মেরে ফেলবে।”
একান্ত নির্জনে মুখ ঢেকে, পরিচয় গোপন রাখার শর্তে সাংবাদিকদের হাত ধরে অনুরোধ করে ৪ জন ভুক্তভোগী বলেন, শাহীন ও তার গ্যাংয়ের নামে খুনসহ ৫০ টিরও বেশি মামলা আছে। বিদেশ থেকে ফোন করে চাঁদা চেয়ে মানুষকে আতঙ্কিত করে তুলছে শাহীন। তার কথায় রাজি না হলে দেশে তার গ্যাং দিয়ে হামলা, মারধর করা, কুপিয়ে জখম করাই এদের কাজ। এমনকি মেরেও ফেলে। শাহীন ও তার গ্যাংয়ের উপযুক্ত শাস্তি হলে কাফরুল ভাষানটেক সহ রাজধানীবাসি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলবে। আপনারা আমাদেরকে বাঁচান ভাই।”
একজন মা তার সন্তানকে কুপিয়ে জখম করার ভয়াবহতা বর্ণনা করতে গিয়ে জানান, “শাহীনের দুইজন সন্ত্রাসী জেলখানার ভিতরে যাওয়ার পর বাকি সদস্যরা আরও তৎপর হয়ে উঠেছে। বিভিন্নভাবে যারা মামলা করেছে তাদের জীবনকে বিষন্ন করে তোলে এরা। সবসময় মানুষকে হুমকি-ধান্তির মধ্যে রাখে। তাদেরকে এমন শাস্তির ব্যবস্থা করা হোক- যাতে আর কখনো মানুষ হত্যা করার মত কোন কার্যক্রম না করতে পারে। তাদে ফাঁসির ব্যবস্থা করা হোক।”
কাফরুলের এক হোটেল ব্যবসায়ীর আত্মীয় বলেন, “শাহীন ভারতে আটক হয়েছে। তাই হয়তো কিছুদিন আমরা একটু স্বস্তিতে আছি, তবুও তার চেলাপেলা, গ্যাং থেমে নেই। বড় কথা হলো ও (শাহীন) যদি এবার ইন্ডিয়া থেকে ছাড়া পেয়ে যায়, তাহলে কাফরুল, ভাষানটেক, মিরপুরের জনগণকে কুপিয়ে তাদের জীবন বিপন্ন করে তুলবে। কারণ আমরা কিছু মানুষ থানা ও সাংবাদিকদের কাছে অভিযোগ করাই ওরা ব্যাপক ক্ষিপ্ত। মানুষের সাধারণ জীবন ব্যাহত করে ফেলবে এটা নিশ্চিত। তাই আমরা চাই, শাহীন শিকদারের মতো জঘন্য অপরাধীর আইনের আওতায় এনে ফাঁসির ব্যবস্থা করা হোক।”
কিছু মহিলা ভুক্তভোগী অভিযোগ করে বলেন, “কাফরুলে পুলিশ স্টাফ কলেজ সংলগ্ন, পুলিশ কনভেনশন হলের পাশে জিরো পয়েন্টে সন্ত্রাসী জুম্মনের মা জরিনার একটা চায়ের দোকান আছে। জুম্মনের মা বিভিন্ন ব্যক্তিকে টার্গেট করতে তার ছেলেকে সাহায্য করে। এমনকি ছুরি, চাপাতি, দেশীয় অস্ত্র ওই জরিনার দোকানেই থাকে। মূলত ছোট দোকানটার আড়ালে জরিনা সেখানে ইয়াবা, গাজা সহ মাদক বিক্রি এবং অনেক যায়গায় সাপ্লাই দেয়। সেখানে মিরপুর ১১, স্বর্নপট্টি সংলগ্ন বিহারি ক্যাম্পের আসিফ নিয়মিত যাতায়াত করে। ওখানে থেকে বিহারি আসিফ মাদক নিয়ে নিজে সেবন করে এবং মিরপুর বিক্রি করে। বিশেষ করে মিরপুর ১১ ডুইপ প্লটে হেরোইন মোস্তাকের ছেলে ইয়াবা সুমন ও তার ভাইদের কাছে মাদক পাঠায় আসিফ। আসিফ লোকজনকে বলে- ও (বিহারি আসিফ) নাকি সেকেন্ড থানা। শাহীনের এসব সন্ত্রাসী বিভিন্ন ব্যক্তিকে, কুপানো, মারধর করা, জিম্মি করা, কিডন্যাপ করার কাজ করে থাকে। তারা চুক্তিতেও মানুষ কোপায়। কি ভয়ংকর বিষয় ভাবা যায় ?”
২২ বছর বয়সী একজন শিক্ষার্থী বলেন, “ভাই শাহীনের লোক শুধু কাফরুলে না, পুরো মিরপুর জুড়েই আছে। আমি মিরপুর ১১ প্যারিস রোডের পাশে কাইল্লার বস্তির মাঠ বা বর্তমান যে খেলার মাঠ আছে, ওখানে যায়। মিরপুর ১১, স্বর্নপট্টির ওই বিহারি আসিফ তার সাথে থাকা ৩ জনকে নিয়ে আমাকে মারধর করে আমার মানিব্যাগ, দুইটা মোবাইল ছিনিয়ে নেয়। আসিফের সাথে মুরাদ ও জুম্মনও ছিলো। সেখানে অনেকে আসিফকে দেখলেও ভয়ে কেউ আমাকে সাহায্য করেনি। এমনকি মিরপুর ১৩ তে ইয়াবা আসিফ বা হিরোন্সি আসিফ তার ৩ জন লোক নিয়ে আবারও একদিন আমাকে ধরে। ওইদিন ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে লোকজন চলে আসলে ২ হাজার নিয়ে দৌড় দেয় আসিফ। আপনি জানলে অবাক হবেন- আসিফ পল্লবী থানার পুলিশকে ভাঙিয়ে বলে ” আমি সেকেন্ড থানা”। পুলিশের কাছে গিয়ে বলিস আসিফ ধরেছে। অর্থাৎ সব যায়গায় শাহীনের লোক আছে।”
ঠিক এভাবেই অসংখ্য ভুক্তভোগী অভিযোগ করেন সন্ত্রাসী শাহীনের বিরুদ্ধে। তবে পরিবার ও নিজের জীবনের ভয়ে সরাসরি থানা বা সাংবাদিকদের কাছে তারা অভিযোগ করতে সাহস পাচ্ছে না। তারা গোপনে মিডিয়ার মাধ্যমে এই অভিশাপ থেকে পুলিশের সাহায্য কামনা করছে।
খুবই অবাক করার বিষয়- ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে শাহীন রাজধানীর এক ব্যক্তিকে সরাসরি ফোন করে ৫০ লক্ষ টাকা চাঁদা দাবি করে। এমন কয়েকটি অডিও রেকর্ড আমাদের হাতে এসেছে। সেখানে শাহীন চাঁদা চেয়ে হুমকি দিয়ে বলছে; “আপনি কিন্তু দেরি করছেন, আপনার সময় শেষ হয়ে যাচ্ছে। মানুষের কথা না শুনে দ্রুত আমার সাথে যোগাযোগ করেন, দেখা করেন। টাকা দিয়ে দেন তাহলে আর সমস্যা হবে না। আপনি এমপি, মন্ত্রী, প্রশাসন যা-ই করেন না কেনো, কোনো লাভ নেই। দেখেন প্রধান উপদেষ্টারে আমারে ফোন দিয়াইতে পারেন নাকি… তবুও কোনো লাভ নেই। কথা না শুনলে ক্ষতি কিন্তু আপনি ও আপনার পরিবারেরই হবে। এর আগে যারা আমার কথা শুনেনি, তারা কেউ মেডিকেলে গেছে, কেউ কবরে গেছে। পরে মেডিকেল দেয় ২০ লাখ, আমারে দেয় ৩০ লাখ। আপনার কাছে কমই চাইছি, ৫০ লাখ। তাই ভালোই ভালোই আমার সাথে যোগাযোগ করেন, টাকা দেন।”
ঠিক এভাবেই টার্গেটকৃত ব্যক্তিদের কাছে ফোন করে সরাসরি চাঁদা চাই শাহীন। চাঁদা না দিলে মারপিট, কুপিয়ে জখম করা, পরিবারের সদস্যদের হেনস্তা ও হামলা, স্ত্রী সন্তানকে তুলে নিয়ে যাওয়ার হুমকি সহ নানাভাবে হয়রানি করতে থাকে শাহীন ও তার গ্যাং।
সম্প্রতি কাফরুল থানা পুলিশ শাহীনের দুই গ্যাং সদস্যকে আটক করে। জানতে চেয়ে কাফরুল থানার এসআই শরিফুজ্জামান শরিফকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেন নি। এমনকি তিনি পরবর্তীতে ফোনকল ব্যাকও করেন নি।
দর্শক এটা ছিলো শাহীন ও তার গ্যাংয়ের চাঁদাবাজি, রাহাজানি, সন্ত্রাসের কিছু নমুনা মাত্র। যেখানে ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ শাহীন ও তার গাংয়ের সবার ফাঁসি চান। ভারতের জেল থেকে ছাড়া পেলেও শাহীন যেনো বাইরে না থাকে, সে বিষয়ে তারা পুলিশের সহায়তা চান। আমাদের পরের পর্বে আসবে শাহীনের কালো জগতের আরও বিস্তারিত তথ্য।
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ আকাশ চৌধুরী, মোঃ আবুল বাসার, উপদেষ্টা সম্পাদক, মোঃ আব্দুল মতিন খান, প্রধান সম্পাদক,
মোঃ ইসমাইল হোসেন হৃদয়, বার্তা সম্পাদক
সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত ©২০২৪ আকাশ বিডি নিউজ